বাংলাদেশের প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামে আলেম ও মাদ্রাসা ছাত্র সমাজের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা।
আজ আমরা যখন ইতিহাসের কথা বলি—স্বাধীনতার, অধিকার আদায়ের, অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের—তখন এক শ্রেণির মানুষের অবদান আমাদের স্মৃতিপটে কমই উঠে আসে। তাঁরা হলেন আলেম সমাজ ও মাদ্রাসার ছাত্র । অথচ ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—এই বাংলার প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামে আলেম মাদ্রাসার ছাত্র ইসলামপন্থীদের ছিল অগ্রণী, সাহসী ও আত্মত্যাগে ভরা ভূমিকা।
১. ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে আলেমদের ভূমিকা:
ফতওয়া ও সংগ্রাম: ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিপ্লবে আলেমদের ভূমিকা ছিল অন্যতম। মাওলানা কারামত আলী জৈনপুরী, মাওলানা ইনায়েত আলী, মাওলানা শহীদ আমীন সাহেব, প্রমুখ আলেমগণ ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে ফতওয়া দেন এবং লোকজনকে জাগ্রত করেন।
দারুল উলুম দেওবন্দ প্রতিষ্ঠা ও নেতৃত্ব: ব্রিটিশবিরোধী ইসলামী চেতনার ঘাঁটি ছিল এই দেওবন্দ। এখান থেকেই জন্ম নেয় জামিয়াতে উলামায়ে হিন্দ, যারা বলেছিল “ইসলামের দৃষ্টিতে ব্রিটিশ শাসন অবৈধ”—এমন ফতওয়া শতশত আলেম স্বাক্ষর করে প্রকাশ করেন।
শাহ আবদুল করিম রহ., তিতুমীর (সৈয়দ মীর নিসার আলী)—এরা ছিলেন একাধারে আলেম, সংগঠক এবং যোদ্ধা। তিতুমীর তো ‘বাঁশের কেল্লা’ গড়ে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীকে রীতিমতো চ্যালেঞ্জ করেছিলেন।
২. একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে আলেমদের ভূমিকা:
কিছু লোকের ভুল বা বিকৃত ইতিহাস দেখে আজ আমরা বিভ্রান্ত হই। কিন্তু সত্য হলো—অনেক আলেম, মাদরাসার ছাত্র ও শিক্ষকরা সক্রিয়ভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন।
মাওলানা আবদুর রহিম, মাওলানা তাজউদ্দিন, মাওলানা শাহ আবদুল ওয়াহহাব, মুফতি আমানুল্লাহ, প্রমুখ অনেক আলেম মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা করেছেন, চিকিৎসা দিয়েছেন, আশ্রয় দিয়েছেন এবং ফতওয়া দিয়েছেন—এই যুদ্ধ হক ও বাতিলের যুদ্ধ।
চট্টগ্রাম, সিলেট, বগুড়া, ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন অঞ্চলে মাদরাসা ভিত্তিক অনেক আলেম মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা করেছেন। মাদ্রাসাগুলো ছিল আশ্রয়কেন্দ্র, রান্নাঘর, কখনো আবার অস্ত্র লুকানোর নিরাপদ স্থান।
দারুল উলুম হাটহাজারী ও আল জামিয়াতুল আহলিয়া কাসেমিয়া (বড় কাটরা মাদ্রাসা) মুক্তিযুদ্ধে নীরব সহায়তা করেছে।
৩. ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান ও রাজনৈতিক আন্দোলনে মাদ্রাসার ছাত্র ও আলেমদের অবদান:
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে যখন বাংলাদেশে ফ্যাসিস্ট শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতা রাস্তায় নামে, একপর্যায়ে যখন আন্দোলন প্রায় থেমে গেল তখন যাত্রাবাড়ী মাদ্রাসার ছাত্ররা রাজ পথ দখল নিয়ে আন্দোলনকে নতুন প্রাণ দেয়।শুধু যাত্রাবাড়ী না প্রত্যেকটা জেলায় জেলায় মাদ্রাসার ছাত্ররা যেভাবে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছে এবং ত্যাগ করেছে সেটা অনস্বীকার্য। একদল আলেম নির্ভয়ে কণ্ঠ তুলে বলেন—“সত্যের পক্ষে থাকাই ঈমানের দাবি।”
অনেক তরুণ আলেম মিছিলের সামনে দাঁড়িয়েছেন, লাঠি-গুলি-টিয়ার গ্যাস উপেক্ষা করে আওয়ামী ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলেছেন।
শায়খুল হাদীস মাওলানা মামুনুল হক, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এর আমির মুফতী সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করিম পীর সাহেব চরমোনাই,মুফতী সৈয়দ মোহাম্মদ ফয়জুল করিম শায়েখে চরমোনাই এর অবদান বাদ দিয়ে ২৪ এর উভুত্থানের ইতিহাস কোন ইতিহাসবিদ লিখতে পারবে না এবং তাদের অনুসারীরা সবসময় ইসলামি রাষ্ট্রচেতনার কথা বলেছেন, শোষণের বিরুদ্ধে মুখ খুলেছেন।
কিছু আলেম শারীরিকভাবে এই আন্দোলনে অংশগ্রহণ না করলেও—জুমার খুতবায়, ওয়াজে, সোশ্যাল মিডিয়ায় ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন এবং জনগণকে সচেতন করেছেন।
আজকের এই যুগে প্রয়োজন আবার সেই আত্মত্যাগী, সত্যনিষ্ঠ আলেমদের। যারা কেবল মসজিদে নয়—সমাজের নেতৃত্বেও ভূমিকা রাখবেন, সাহসের সঙ্গে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াবেন।
আলেম সমাজ কেবল নামাজ-রোজার কথা বলবেন না—তারা বলবেন দুর্নীতি, নিপীড়ন, শোষণের বিরুদ্ধে। বলবেন ন্যায়বিচার, ইনসাফ ও খেলাফতভিত্তিক রাষ্ট্রচেতনার পক্ষে।
আজ যারা আলেমদের ভূমিকা ভুলে যেতে চান, তারা শুধু ইতিহাস বিকৃত করছেন না—ভবিষ্যতের পথও বন্ধ করছেন।
স্লোগান হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন:
“যে ইতিহাস জানে না, সে জাতি কখনো জাগতে পারে না—আলেমদের অবদান স্মরণ করো, নতুন জাগরণ সৃষ্টি করো!”
হযরত আলী উসমান
সংগঠক
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন সিরাজগঞ্জ জেলা।
২১/৭/২০২৫. রোজ: সোমবার
মাদ্রাসা প্রতিরোধ দিবস