সারাদেশে নতুন শিক্ষাক্রম নিয়ে নানা সমালোচনা চলছে, এরই মধ্যে সপ্তম শ্রেণির ইতিহাস ও সামাজিক বিজ্ঞান বইয়ে শরীফ এবং শরীফের গল্প নিয়ে চলছে আলোচনার ঝড়, ব্র্যাক
বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক প্রকাশ্য বইয়ের ৫১-৫২ পাতা ছিড়ে ফেলে এবং এর জন্য তাকে চাকরিচুৎ করা নিয়ে আলোচনার আরো দীর্ঘ হচ্ছে।
অন্য দিকে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা তাদের ক্যাম্পাসের মূল ফটোকে ফটোকে তালা ঝুলিয়ে আন্দোলন শুরু করেছে।
এখন মূল কথা হল আসলে কি এই শরীফ-শরিফা? খবরে কাগজে অনেকেই জেনেছি কিন্তু গল্পটা পড়িনি, আসুন আমরা জেনে নেই আসলে মূল গল্পটা কি,, সপ্তম শ্রেণির ইতিহাস ও সামাজিক বিজ্ঞানের ৪৪ পাতায় সম্প্রদয় পরিচিতি অধ্যায়ের আকলিমা আপার নানা সম্প্রদায় নিয়ে আলোচনা করতে ৫১ পাতায় নতুন পরিচিতি সম্পদয়ে উঠে আসে শরীফ বা শরিফাকে পরিচিত করে দেয়-
মূল বইয়ের গল্পটা হুবহুব তুলে ধরা হলো:
নতুন পরিচয় পরের ক্লাসে খুশি আপা একজন অতিথিকে সঙ্গে নিয়ে এলেন। তিনি বললেন, ইনি ছোটবেলায় তোমাদের স্কুলে সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছেন। আজ এসেছেন, নিজের স্কুলটা দেখতে। সুমন জানতে চাইল, আপনার নাম কী? তিনি বললেন, আমার নাম শরীফা আকতার। শরীফ শরীফা বললেন, যখন আমি তোমাদের স্কুলে পড়তাম তখন আমার নাম ছিল শরীফ আহমেদ। আনুচিং অবাক হয়ে বলল, আপনি ছেলে থেকে মেয়ে হলেন কী করে? শরীফা বললেন, আমি তখনও যা ছিলাম এখনও তাই আছি। নামটা কেবল বদলেছি। ওরা শরীফার কথা যেন ঠিকঠাক বুঝতে পারল না। আনাই তাকে জিজ্ঞেস করল, আপনার বাড়ি কোথায়? শরীফা বললেন, আমার বাড়ি এখান থেকে বেশ কাছে। কিন্তু আমি এখন দূরে থাকি। আনাই মাথা নেড়ে বলল, বুঝেছি, আমার পরিবার যেমন অন্য জায়গা থেকে এখানে এসেছে, আপনার পরিবারও তেমন এখান থেকে অন্য জায়গায় চলে গিয়েছে। শরীফা বললেন, তা নয়। আমার পরিবার এখানেই আছে। আমি তাদের ছেড়ে দূরে গিয়ে অচেনা মানুষদের সঙ্গে থাকতে শুরু করেছি। এখন সেটাই আমার পরিবার। শরীফা নিজের জীবনের কথা বলতে শুরু করলেন।
শরীফ থেকে শরীফা হওয়ার গল্প
শরীফার গল্প ছোটবেলায় সবাই আমাকে ছেলে বলত। কিন্তু আমি নিজে একসময়ে বুঝলাম, আমার শরীরটা ছেলেদের মতো হলেও আমি মনে মনে একজন মেয়ে। আমি মেয়েদের মতো পোশাক পরতে ভালোবাসতাম। কিন্তু বাড়ির কেউ আমাকে পছন্দের পোশাক কিনে দিতে রাজি হতো না। মায়ের সঙ্গে ঘরের কাজ করতে আমার বেশি ভালো লাগত। বোনদের সাজবার জিনিস দিয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে সাজতাম। ধরা পড়লে বকাঝকা, এমনকি মারও জুটত কপালে। মেয়েদের সঙ্গে খেলতেই আমার বেশি ইচ্ছে করত। কিন্তু মেয়েরা আমাকে খেলায় নিতে চাইত না। ছেলেদের সঙ্গে খেলতে গেলেও তারা আমার কথাবার্তা , চালচলন নিয়ে হাসাহাসি করত। স্কুলের সবাই, পাড়া-পড়শি এমনকি বাড়ির লোকজনও আমাকে ভীষণ অবহেলা করত। আমি কেন এ রকম একথা ভেবে আমার নিজেরও খুব কষ্ট হতো, নিজেকে ভীষণ একা লাগত।
এক দিন এমন একজনের সঙ্গে পরিচয় হলো যাকে সমাজের সবাই মেয়ে বলে কিন্তু সে নিজেকে ছেলে বলেই মনে করে। আমার মনে হলো, এই মানুষটাও আমার মতন। সে আমাকে বলল, আমরা নারী বা পুরুষ নই, আমরা হলাম ‘ট্রান্সজেন্ডার’। সেই মানুষটা আমাকে এমন একটা জায়গায় নিয়ে গেল, যেখানে নারী- পুরুষের বাইরে আরও নানা রকমের মানুষ আছেন। তাদের বলা হয় ‘হিজড়া’ জনগোষ্ঠী। তাদের সবাইকে দেখেশুনে রাখেন তাদের ‘গুরু মা’। আমার সেখানে গিয়ে নিজেকে আর একলা লাগল না, মনে হলো না যে আমি সবার চেয়ে আলাদা। সেই মানুষগুলোর কাছেই থেকে গেলাম। এখানকার নিয়ম-কানুন, ভাষা, রীতি- নীতি আমাদের বাড়ির চেয়ে অনেক আলাদা। তবু আমরা সবার সুখ-দু:খ ভাগ করে নিয়ে একটা পরিবারের মতনই থাকি। বাড়ির লোকজনের জন্যও খুব মন খারাপ হয় কিন্তু তারা আমাকে আর চায় না, আশপাশের লোকের কথায়ও তাদের ভীষণ ভয়। আজ থেকে বিশ বছর আগে বাড়ি ছেড়েছি। সেই থেকে আমি আমার নতুন বাড়ির লোকদের সঙ্গে, নতুন শিশু আর নতুন বর-বউকে দোয়া-আশীর্বাদ করে পয়সা রোজগার করি। কখনও কখনও লোকের কাছে চেয়ে টাকা সংগ্রহ করি। কিন্তু আমাদের ইচ্ছে করে সমাজের আর দশটা স্বাভাবিক মানুষের মতো জীবন কাটাতে, পড়াশোনা, চাকরি-ব্যবসা করতে। কিন্তু বেশির ভাগ মানুষ আমাদের সঙ্গে মিশতে চায় না, যোগ্যতা থাকলেও কাজ দিতে চায় না। আমাদের মতো মানুষ পৃথিবীর সব দেশেই আছে। অনেক দেশেই তারা সমাজের বাকি মানুষের মতনই জীবন কাটায়। তবে আমাদের দেশের অবস্থারও বদল হচ্ছে। ২০১৩ সালে সরকার আমাদের স্বীকৃতি দিয়েছে। বিভিন্ন সরকারী ও বেসরকারী প্রতিষ্ঠান আমাদের জন্য কাজ করছে। শিক্ষার ব্যবস্থা করছে, কর্মসংস্ র্ম থানের ব্যবস্থা করছে। সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি বদলানোর প্রচেষ্টা নিচ্ছে। নজরুল ইসলাম ঋতু, শাম্মী রানী চৌধুরী, বিপুল বর্মণে র মতো বাংলাদেশের অনেক ট্রান্সজেন্ডার এবং হিজড়া জনগোষ্ঠীর মানুষ সমাজজীবনে এবং পেশাগত জীবনে সাফল্য পেয়েছেন। জনাব নজরুল ইসলাম রিতু হিজড়া সম্প্রদায় থেকে প্রথম নির্বাচি ত ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জনাব রানী চৌধুরী, উন্নয়ন কর্মী, বেসরকারী সংস্থা এবং জাতীয় পর্যায়ের নৃত্য শিল্পী জনাব লিনিয়া শাম্মী বিউটিশিয়ান এবং উন্নয়ন কর্মী জনাব বিপুল বর্মণ ঢাকার একটি বায়িং হাউজে কর্মরত
নতুন প্রশ্ন ওরা এত দিন জানত, মানুষ ছেলে হয় অথবা মেয়ে হয়। এখানেও যে বৈচিত্র্য থাকতে পারে, সে কথা ওরা কখন শোনেনি, ভাবেওনি। কিন্তু শরীফা আলাদা রকম বলে সবাই তাকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে, এমনকি তার পরিবারের লোকেরাও! শরীফার জীবন-কাহিনি শুনে সবার মন এমন বিষাদে ডুবে গেল যে তাকে আর বেশি প্রশ্ন করতেও ইচ্ছে করল না। গণেশ, রনি, অন্বেষা, ওমেরা আর নীলা সেদিন বাড়ি ফেরার পথে গল্প করছিল: গণেশ: তাহলে ছেলে এবং মেয়ে ছাড়াও ভিন্ন রকমের মানুষও হয়। রনি: আমার মা বলেন, ছোটদের কোনো ছেলে-মেয়ে হয় না। বড় হতে হতে তারা ছেলে বা মেয়ে হয়ে ওঠে। অন্বেষা: আমার জানতে ইচ্ছে করছে, আমাদের সময় ছেলে বা মেয়েদের পোশাক, আচরণ, কাজকর্ম যেমন দেখি, প্রাচীন মানুষেরও কি তেমন ছিল? সামনের সময়েও কি এমনটা থাকবে? রফিক: পৃথিবীর সব দেশে, সকল সম্প্রদায়ে কি ছেলে-মেয়ের ধারণা, তাদের চেহারা, আচরণ, সাজপোশাক একই রকম? নীলা: আমার মা আমাকে বেগম রোকেয়ার লেখা একটা গল্প পড়ে শুনিয়েছিলেন। গল্পটার নাম ‘সুলতানার স্বপ্ন’। সেখানে এমন একটা জায়গা কল্পনা করা হয়েছে যেখানে ছেলে আর মেয়েদের প্রচলিত ভূমিকা উল্টে গিয়েছে