আজকের প্রত্রিকাগুলোর প্রধান প্রধান খবর:
যুগান্তর:
ভালো নেই ব্যাংক খাত
এই মুহূর্তে ভালো নেই ব্যাংক খাত। সীমাহীন অনিয়ম, দুর্নীতি এবং লুটপাটের কারণে গ্রিনের (ভালো) চেয়ে লাল (অতি দুর্বল) ও হলুদ (দুর্বল) বাতি জ্বলা ব্যাংকের সংখ্যাই বেশি। সম্প্রতি এ সংক্রান্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি গোপন প্রতিবেদন প্রকাশ হওয়ার পর হইচই পড়ে যায়। এরপর এ নিয়ে শুরু হয় লুকোচুরি এবং পালটাপালটি অভিযোগ। এমনকি, গত সপ্তাহের শেষের ২ দিন গণমাধ্যমকর্মীদের বাংলাদেশ ব্যাংকে প্রবেশে বাধা দেওয়া হয়। নানা জেরার মুখোমুখি হতে হয় সাংবাদিকদের। বাংলাদেশ ব্যাংকের দাবি, এটা পুরো খাতের চিত্র নয়। প্রতিবেদনটি গবেষণার জন্য করা হয়। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. মেজবাউল হক বলেন, সম্প্রতি গণমাধ্যমে ব্যাংকগুলোর লাল, হলুদ ও সবুজ তালিকাভুক্তির যে প্রতিবেদন ছাপা হয় তা ব্যাংকের স্বাস্থ্য দেখার কোনো সঠিক পদ্ধতি নয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন বিভাগ নানা সময়ে ব্যাংকের তালিকা করে থাকে। এই তালিকাটা ধারণাভিত্তিক। যেখানে কোন পরিস্থিতি হলে কী হবে, তা বিবেচনায় নেওয়া হয়। এটা গবেষণার কাজে ব্যবহার হয়। ব্যাংকের স্বাস্থ্য দেখার একমাত্র উপাদান নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন, যা ‘ক্যামেলস’ পদ্ধতির মাধ্যমে দেখা হয়।
প্রায় অভিন্ন মন্তব্য ব্যাংক পরিচালকদের পক্ষ থেকেও আসে। ব্যাংক পরিচালকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি) চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার বলেন, এটা ভুল প্রতিবেদন। এর কোনো বাস্তবতা নেই।
ব্যাংক থেকে টাকা-পয়সা নিয়ে যাচ্ছেন পরিচালকরা সে কারণে খেলাপি ঋণ বেড়ে যাচ্ছে, ব্যাংক দুর্বল হচ্ছে। এর দায় কি এড়াতে পারবেন? এমন প্রশ্নে বিএবির চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার বলেন, এটা আমাদের দেখার বিষয় নয়। এটা দেখবে বাংলাদেশ ব্যাংক। আমরা টাকা-পয়সা নিইনি। কোনো প্রমাণ আছে? ব্যাংক খাতে কোনো অনাস্থা নেই। যদি তাই হতো তবে ১০টি ব্যাংক দেউলিয়া হয়ে যেত। তিনি বলেন, ৯টি ব্যাংক রেড জোনে, ২৯টি ব্যাংক ইউলো জোনে এবং ১৬টি ব্যাংক গ্রিন জোনে যাওয়ার প্রতিবেদনটি সঠিক নয়। এটা একটা অবাস্তব প্রতিবেদন। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, সীমান্ত ব্যাংকের মতো একটি ছোট্ট ব্যাংক গ্রিন জোনে আর ব্র্যাক ব্যাংক ইয়েলো জোনে-এটা হতে পারে? এত ব্যাংক একসঙ্গে ইয়েলো জোনে-এটা কখনওই সম্ভব নয়। প্রতিবাদ জানিয়েছি। গভর্নর দুঃখ প্রকাশ করেছেন। আর হাজার হাজার পরিচালকের মধ্যে দু-একজন খারাপ থাকতেই পারেন। এজন্য সব পরিচালককে দোষ দেওয়া যাবে না। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি কিছুটা উত্তেজিত হয়ে বলেন, এক্সিম ব্যাংক থেকে নামে-বেনামে ‘আমি নজরুল ইসলাম মজুমদার’ টাকা নিয়েছি, এটা কেউ প্রমাণ করতে পারলে করেন।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) সাবেক মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমেদ চৌধুরী বলেন, প্রতিবেদন গবেষণার জন্য নাকি অন্য কিছুর জন্য সেটা আলাদা বিষয়। মূল কথা হলো-ব্যাংক যেটার যে মান সেটাই তো দেওয়া হয়েছে। এখানে অস্বীকার করার কিছু নেই। দেশের ব্যাংক খাত কেমন আছে এটা সবাই কম-বেশি জানেন। যারা অস্বীকার করছেন, তারাও জানেন ব্যাংক খাত ভালো নেই। তিনি একটি উপমা দিয়ে বলেন, কয়েকদিন আগে একটি ব্যাংকের চেয়ারম্যান অর্থমন্ত্রীকে বলছেন, স্যার আপনারা বলেন ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ৮-৯ শতাংশ। প্রকৃত খেলাপি ঋণ কত তা তো আমরাই জানি কিন্তু প্রকাশ করতে পারি না। ড. তৌফিক আহমেদ চৌধুরী আরও বলেন, একটা দেশের ব্যাংক খাত এত খেলাপি ঋণ নিয়ে কীভাবে চলে এটা বুঝে আসে না। খেলাপি ঋণের এসব টাকা ডলারে কনভার্ট হয়ে ইউরোপ-আমেরিকা চলে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে ব্যাংক খাতকে ভালো এবং সুস্থ বলার সুযোগ খুব কম। এখন দোষারোপ এবং লুকোচুরি না করে উত্তরণের পথ খুঁজে নিতে হবে। এর জন্য সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা খুবই জরুরি।
প্রথম আলো:
বেঁধে দেওয়া দামে বিক্রি হচ্ছে না বেশির ভাগ পণ্য
বাজার পরিস্থিতি
এক সপ্তাহ আগে ২৯টি পণ্যের ‘যৌক্তিক মূল্য’ নির্ধারণ করা হলেও বাজারে বেশির ভাগ পণ্যের ক্ষেত্রে সেই দামের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।
সরকার বেশ কিছু নিত্যপণ্যের ‘যৌক্তিক মূল্য’ নির্ধারণ করে দিলেও তা মানার ব্যাপারে আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না রাজধানী ঢাকার খুচরা বিক্রেতাদের। রোজার মধ্যে পণ্যের বাড়তি দাম নিয়ন্ত্রণে গত শুক্রবার মোট ২৯টি পণ্যের দাম নির্ধারণ করে দেয় সরকারি সংস্থা কৃষি বিপণন অধিদপ্তর। এক সপ্তাহ পর বাজার ঘুরে দেখা গেছে, নির্ধারিত সেই দরে বাজারে পণ্য বিক্রি হচ্ছে না। তবে গত এক সপ্তাহে খুচরা বাজারে কয়েকটি পণ্যের দাম কমলেও কিছু পণ্যের দাম বরং আগের তুলনায় বেড়েছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর শেওড়াপাড়া, তালতলা ও মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেট ঘুরে এবং ক্রেতা ও বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এক সপ্তাহের ব্যবধানে বাজারে আলু, রসুন, জিরা ও চালের দাম বেড়েছে। তবে এ সময় কমেছে পেঁয়াজ, ব্রয়লার মুরগি, মসুর ডাল ও ডিমের দাম। এ ছাড়া কমেছে কয়েক ধরনের সবজির দামও। তবে এসব পণ্যের দাম কমলেও তা সরকারের ঘোষণা করা যৌক্তিক মূল্যের চেয়ে এখনো বেশি
যেমন রোজার শুরুতে প্রতি কেজি ব্রয়লার ও সোনালি মুরগির দাম ছিল যথাক্রমে ২৩০ ও ৩৪০ টাকা। গতকাল রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে ব্রয়লার মুরগি ২১০ টাকা ও সোনালি মুরগি ৩১০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। অথচ কৃষি বিপণন অধিদপ্তর ব্রয়লার মুরগির দাম ১৭৫ টাকা ও সোনালি মুরগির দাম ২৬২ টাকা কেজি নির্ধারণ করেছে।
এ বছর রোজা শুরুর আগেই কিছু পণ্যের দাম হঠাৎ বেড়ে যায়। আর কিছু পণ্য আগে থেকেই বেশি দামে বিক্রি হচ্ছিল। ফলে রোজার সময় অতিরিক্ত খরচের চাপ নিয়ে শঙ্কায় ছিলেন সাধারণ মানুষ। এমন প্রেক্ষাপটে কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীন সংস্থা কৃষি বিপণন অধিদপ্তর উৎপাদন খরচ বিবেচনায় ২৯টি পণ্যের দাম নির্ধারণ করে দেয়।
এর আগে গত বছরের সেপ্টেম্বরে সরকার ডিম, আলু ও দেশি পেঁয়াজের দাম বেঁধে দিয়েছিল। কিন্তু কয়েক সপ্তাহ পার হওয়ার পরও যখন বাজারে এই তিন পণ্যের দাম কমেনি, তখন সরকার ডিম ও আলু আমদানির অনুমতি দেয়। এরপর এসব পণ্যের দাম কমে আসে।
কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, খুচরা বাজারে প্রতি কেজি গরুর মাংস ৬৬৫ টাকা বিক্রি হওয়ার কথা। তবে গতকাল রাজধানীর তিনটি বাজারে ঘুরে দেখা গেছে, ৭৫০-৭৮০ টাকা কেজি গরুর মাংস বিক্রি হচ্ছে। উত্তর শাহজাহানপুরের খলিল গোশত বিতানে রোজার শুরুর দিন থেকে প্রতি কেজি গরুর মাংস ৫৯৫ টাকা বিক্রি করা হচ্ছিল।
মানবজমিন:
এবার ফিতরা সর্বনিম্ন ১১৫ টাকা
এ বছর বাংলাদেশে ফিতরার হার জনপ্রতি সর্বনিম্ন ১১৫ টাকা এবং সর্বোচ্চ ২ হাজার ৯৭০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। গতকাল ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত জাতীয় ফিতরা নির্ধারণ কমিটির সভায় এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
এতে সভাপতিত্ব করেন সাদাকাতুল ফিতর নির্ধারণ কমিটির সভাপতি ও বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের খতিব হাফেজ মুফতি মাওলানা মোহাম্মদ রুহুল আমিন। এতে ফিতরা নির্ধারণ কমিটির সদস্য ও বিশিষ্ট আলেমরা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠক শেষে কমিটির সভাপতি সাংবাদিকদের ফিতরার হার জানান।
সভায় সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হয় যে, ইসলামী শরীয়াহ মতে মুসলমানরা সামর্থ্য অনুযায়ী গম, আটা, খেজুর, কিসমিস, পনির ও যবের যেকোনো একটি পণ্যের নির্দিষ্ট পরিমাণ বা এর বাজার মূল্য ফিতরা হিসেবে গরিবদের মধ্যে বিতরণ করতে পারবেন।
গম ও আটার ক্ষেত্রে পরিমাণ এক কেজি ৬৫০ গ্রাম (অর্ধ সা’)। খেজুর, কিশমিশ, পনির ও যবের ক্ষেত্রে ৩ কেজি ৩০০ গ্রামের (এক সা’) মাধ্যমে সাদকাতুল ফিতর (ফিতরা) আদায় করতে হয়। এসব পণ্যের বাজার মূল্য হিসাব করে সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন ফিতরা নির্ধারণ করা হয়। হাফেজ মুফতি মাওলানা রুহুল আমিন জানান, উন্নতমানের আটা বা গমের ক্ষেত্রে ফিতরা এক কেজি ৬৫০ গ্রাম (অর্ধ সা’) বা এর বাজার মূল্য ১১৫ টাকা। যবের ক্ষেত্রে (এক সা’) ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম বা এর বাজার মূল্য ৪০০ টাকা ফিতরা দিতে হবে। এ ছাড়া ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম কিশমিশ বা এর বাজার মূল্য দুই হাজার ১৪৫ টাকা দিয়ে ফিতরা আদায় করা যাবে। খেজুরের ক্ষেত্রে ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম বা এর বাজার মূল্য দুই হাজার ৪৭৫ টাকা ও পনিরের ক্ষেত্রে ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম বা এর বাজার মূল্য ২ হাজার ৯৭০ টাকা দিয়ে ফিতরা আদায় করতে হবে বলে জানান কমিটির সভাপতি।
কালের কন্ঠ:
প্রকাশ্যে ভারত বিরোধিতা শুরু বিএনপির
জাতীয় নির্বাচন ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে ভারতের নিরপেক্ষ ভূমিকার প্রত্যাশায় অনেক দিন ‘নিশ্চুপ’ থেকে অবস্থান বদল করেছে বিএনপি। গত ৭ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে হঠাৎ ভারতের বিরুদ্ধে সোচ্চার হন দলের শীর্ষ নেতৃত্বসহ গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন নেতা। নির্বাচনের পর ভারত বিরোধিতায় আরো সরব হয়েছেন দলের নেতাকর্মীরা।
ভারতীয় পণ্য বর্জনের পক্ষে কিছুদিন ধরে বাংলাদেশে যে প্রচারণা চলছিল, গত বুধবার সেই কার্যক্রমে সংহতি প্রকাশ করেছেন বিএনপির একজন মুখপাত্র।
এর পরই দলটির ভারত বিরোধিতার বিষয়টি বেশ আলোচনায় আসে। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, বিএনপি কি তাহলে আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতবিরোধী অবস্থান নিল? দলীয়ভাবেই ভারতীয় পণ্য বর্জন প্রচারণায় জড়িয়ে পড়ল?
এ নিয়ে দলের ভেতরেও নানা আলোচনা আছে। ভারতের বিষয়ে বিএনপির অবস্থান আসলে কী তা নিয়ে দলের নেতাদের মধ্যে বিভ্রান্তিও আছে। ফলে ভারতের বিষয়ে এক সুরে বক্তব্য আসছে না।
বিষয়টি সুরাহার জন্য দলের স্থায়ী কমিটির পরবর্তী বৈঠকে আলোচনা হতে পারে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।
তবে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল মিন্টু মনে করেন, জনগণের দল হিসেবে বিএনপি জনগণের দাবি, মতামত ও বিবেচনাবোধকে অগ্রাহ্য করতে পারে না।
বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের তিনজন নেতার সঙ্গে কথা হলেও তাঁরা কেউ নাম প্রকাশ করে কথা বলতে রাজি হননি। ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় তাঁরা কালের কণ্ঠকে বলেন, ভারতের বিষয়ে দলের অবস্থান কী সে বিষয়ে বিভিন্ন সময় দলীয় ফোরামে আলোচনা হলেও আনুষ্ঠানিক কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
নয়াদিগন্ত:
ভুটান থেকে বিদ্যুৎ আমদানিতে ভারতের সহযোগিতা চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আজ ভুটান থেকে ভারতের ভূমি ব্যবহার করে বিদ্যুৎ আমদানিতে সহযোগিতা চেয়েছেন।
বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মা গতকাল প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে তার সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে এলে প্রধানমন্ত্রী এই সহযোগিতা প্রত্যাশা করেন। বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রীর স্পিচ রাইটার মো: নজরুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী প্রত্যাসিত বিদ্যুৎ সহজে আমদানি করতে ভারত পক্ষের সহায়তা চেয়েছেন।’
ব্রিফিংয়ে নজরুল ইসলাম উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ ভুটান থেকে বিদ্যুৎ আমদানি করবে এবং আগামী ২৫ মার্চ ভুটানের রাজা জিগমে খেসার নামগিয়ালের ঢাকা সফরের সময় এ বিষয়ে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে।
বাংলাদেশ ভুটান থেকে বিদ্যুৎ আমদানির পরিকল্পনা করছে এবং ভুটান ও বাংলাদেশের মধ্যে আলোচনা প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
শেখ হাসিনা বাংলাদেশ থেকে পাট ও পাটজাত পণ্য আমদানির জন্য এন্টি-ডাম্পিং ব্যবস্থা প্রত্যাহারের জন্য ভারত সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। এছাড়া তিনি হাইকমিশনারকে বলেন, ভারত সৈয়দপুর রেলওয়ে ওয়ার্কশপটি আধুনিকায়ন করতে পারে।
বৈঠকে ভারতের আসন্ন নির্বাচন প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ধারাবাহিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাই বাংলাদেশের অভূতপূর্ব উন্নয়ন সম্ভব করেছে। তিনি উল্লেখ করেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর এবং ১৯৯৬ সালের আগে নির্বাচনে জয়লাভের সিদ্ধান্ত এবং কোন দল ক্ষমতায় থাকবে বা আসবে তা নির্দিষ্ট মহল দ্বারা নির্ধারিত হতো।
সে কারণে আওয়ামী লীগ ১৯৯১ সালে জনসমর্থন পেলেও জয়ী হতে পারেনি উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘কিন্তু ১৯৯৬ সালে নির্দিষ্ট মহল গণমানুষের ইচ্ছার কাছে মাথা নত করে। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ প্রথমবারের মতো সে দুষ্টচক্র ভাঙে।’
প্রণয় ভার্মা উল্লেখ করেন যে গত বছর ভারতীয় ঋণ ব্যবস্থার (এলওসি) আওতায় বাংলাদেশে মোট চারটি প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে।
‘এবং আরো দুটি প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য পাইপলাইনে রয়েছে,’ বলেন তিনি।
ভারতীয় হাইকমিশনার রুপি-টাকা দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যিক লেনদেন, ডিজিটাল পেমেন্ট নেটওয়ার্ক এবং বঙ্গবন্ধু বায়োপিকের মতো দুই দেশের কিছু যুগান্তকারী উদ্যোগের কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন যে ভারত সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বের (সিইপিএ) জন্য আলোচনা এগিয়ে নিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
২০২৬ সালে বাংলাদেশের উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের পর এই সিইপিএ সহায়ক হবে বলে উল্লেখ করেন ভারতীয় হাইকমিশনার। তিনি বলেন, এলওসিকে প্রকল্পভিত্তিক করার জন্য একটি নতুন কাঠামো তৈরি করতে নতুন চিন্তাভাবনা ও আলোচনা চলছে।
বৈঠকে বাংলাদেশ, ভুটান ও নেপালের মধ্যে হাই পাওয়ার গ্রিড লাইন স্থাপনের বিষয়ে আলোচনা হয়।
প্রণয় ভার্মা বলেন, ভারত থেকে ডিজেল আমদানির জন্য সৈয়দপুর থেকে নাটোর পর্যন্ত ডিজেল পাইপলাইন সম্প্রসারণের উদ্যোগ রয়েছে। তিনি বলেন যে কিছু বিশ্ব বিখ্যাত প্রতিরক্ষা শিল্প ভারতে তাদের কারখানা স্থানান্তর করছে।
হাইকমিশনার বলেন, বাংলাদেশ ভারতের যৌথ উদ্যোগে এখানে একটি প্রতিরক্ষা কারখানা স্থাপন করতে পারে। তিনি শেখ হাসিনাকে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর শুভেচ্ছা জানান। প্রণয় ভার্মা ভারতের জাতীয় নির্বাচনের পর প্রধানমন্ত্রীকে ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানান এবং তিনি আমন্ত্রণ গ্রহণ করেন।
হাইকমিশনার প্রধানমন্ত্রীকে আরো জানান যে তারা রংপুরে একটি অফিস স্থাপনে আগ্রহী।
জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রস্তাবটি যাচাই-বাছাই করে সরকার বিবেচনা করবে।
প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব মো: তোফাজ্জল হোসেন মিয়া এ সময় উপস্থিত ছিলেন।
বাংলাদেশ প্রতিদিন:
রাস্তায় বাসের কঙ্কাল
ঢাকার চিড়িয়াখানা সড়ক থেকে কুড়িল হয়ে মালিবাগ রুটে চলাচল করে নূর এ মক্কা পরিবহন। কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের সামনে যাত্রী তোলার সময় দেখা যায়, বাসের পেছনের বাম্পার থেকে বডির অংশ খুলে পড়ছে। ভেঙে চুরমার গ্লাস। বাসের রং কোথাও উঠে গেছে, কোথাও মরচে ধরা, অসংখ্য ফুটো, কোথাও বা পোস্টার সাঁটানো। পেছনের অংশের মতো সামনের দিকেও লুকিং গ্লাস ভাঙা, চারটির মধ্যে একটি হেডলাইট নেই। নেই কোনো দিকনির্দেশক বাতি।
রাজধানীজুড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে বাসের কঙ্কাল। ভাঙাচোরা, লক্কড়ঝক্কড় বাসের দৌরাত্ম্য চলছে সড়কজুড়ে। কোনোটির রং চটা, কোনোটির ছাল ওঠা। কোনোটির জানালার গ্লাস ভাঙা, কোনোটির আবার দরজাই নেই। কিছু বাসের আসনগুলোর অবস্থাও করুণ। অনেক বাসের ভিতরে প্রস্রাবের দুর্গন্ধ পাওয়া যায়, সিটে বাসা বেঁধেছে ছারপোকা। দিনের পর দিন এসব ভাঙাচোরা বাস রাস্তায় নামাচ্ছেন মালিকরা। লক্কড়ঝক্কড় বাসের ছাল-চামড়া খুলে পড়ছে। এসব বাসকে ফিটনেস সনদ দিচ্ছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ-বিআরটিএ। প্রতিদিন চোখের সামনে দেখেও রাস্তায় এসব বাস চলার অনুমতি দিচ্ছে ট্রাফিক পুলিশ। ফিটনেসবিহীন ও ঝুঁকিপূর্ণ এসব যানবাহনে চলাচল যেমন বিপজ্জনক তেমন নগরীর সৌন্দর্যহানিও ঘটাচ্ছে। বিশৃঙ্খলভাবে চলাচল করায় বাধছে যানজট। এ ব্যাপারে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের গতকাল সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘ঢাকা শহরে এসব গাড়ি তৈরির অনেক কারখানা আছে। আমি নিজে দেখেছি। গাড়িতে রং লাগাচ্ছে। ১০ দিনও থাকে না এসব রং। ঢাকা শহরে প্রাইভেট কার কত আধুনিক। কিন্তু বাসগুলোর দিকে তাকানো যায় না। মফস্বল ও চট্টগ্রামে চলাচল করা গাড়ি (বাস) এর থেকে ভালো। ঢাকার এসব লক্কড়ঝক্কড় গাড়ি আমাদের উন্নয়ন অর্জনকে লজ্জা দেয়।’
সরকারের নীতিমালা না থাকায় এ সুযোগ নিচ্ছেন বাস মালিকরা। দুই দশক আগেও রাজধানী ঢাকায় রুট অনুযায়ী গণপরিবহনের জন্য সুনির্দিষ্ট রং নির্ধারণ করত বিআরটিএ। সংস্থাটির নিয়ম অনুযায়ী, কোনো বাসের রং উঠে গেলে সেটি চলাচলের অনুপযোগী হবে। বিআরটিএ’র সেই সার্কুলার পরবর্তী সময়ে নতুন করে জারি করা হয়নি। বর্তমানে রাজধানীর ২৯১টি রুটে চলাচলকারী বাসের অধিকাংশই এখন লক্কড়ঝক্কড় অবস্থায় চলছে।
গত তিন দিনে রাজধানীর গুলিস্তান, মিরপুর, বাড্ডা, শ্যামলী ও গাবতলী রুটে সরেজমিনে গিয়ে এমনই দৃশ্য চোখে পড়েছে। লোকাল সার্ভিস, সিটিং সার্ভিস এমনকি টিকিট সার্ভিসের গাড়িতেও একই অবস্থা। গাবতলী থেকে ডেমরা স্টাফ কোয়ার্টার রুটে চলাচল করে অছিম পরিবহন। টেকিনিক্যাল মোড়ে যাত্রী তোলার সময় দেখা যায়, বাসের জানালার কাচ ভেঙে খুলে পড়ছে। পেছনের দিকনির্দেশক বাতির খাঁচা ও স্টিলের বডি ঝুলছে। স্টপেজসহ সব লেখা, রং মুছে গেছে। বাসের তরুণ চালক মো. সুমন বলেন, ‘এ বাসের বয়স মনে হয় আমার বয়সের চেয়েও বেশি। পাল্লাপাল্লি কইরা চলতে হয়। অন্য বাসে ধাক্কা মারে। হুড়োহুড়িতে রং ঠিক থাকে না, গ্লাস ভেঙে যায়। মরিচা পড়েও অনেক অংশ খুলে পড়েছে। মালিক এ গাড়িগুলো কখনো সার্ভিসিংয়ে পাঠায় না, প্রতিদিনই আমাদের বের হতে তাড়া দেয়।’ সাভার, শ্যামলী ঘুরে গুলশান লিঙ্ক রোড হয়ে নতুন বাজার রুটে চলাচল করে বৈশাখী পরিবহন। সাভার থেকে শ্যামলী এসে নিয়মিত অফিস করেন জোবায়ের মাহমুদ। তিনি বলেন, ‘প্রতিটি বাসের পরিস্থিতি খারাপ। জানালা, দরজা ভাঙা। হুহু করে ধুলা এসে পোশাক নোংরা করে দেয়। সিট কোনোটা হেলে পড়েছে, অধিকাংশ সিটেই ফোম নেই। শক্ত লোহার পাতের ওপর বসতে হয় যাত্রীদের। অনেক সময় ভাঙা সিটের লোহা পায়ে লেগে কেটে রক্তাক্ত হয় পা, ছিঁড়ে যায় পোশাক। আর বাইরের চেহারা তো বর্ণনা করা সম্ভব না। কোনো বাসেই রং নেই। ছালবাকল, স্টিলের পাত উঠে বেরিয়ে এসেছে কঙ্কালের মতো ইঞ্জিন।
ফিনল্যান্ডের জাতীয় কবি ইনো লিনো। বিশ্বজুড়ে তার পরিচিতি সুখের কবি হিসেবে। বছর বছর পৃথিবীর মধ্যে ফিনল্যান্ড যে সবচেয়ে সুখী দেশের তকমা পায়, এর নেপথ্যে ভূমিকা রাখে কবি ইনো লিনোর দর্শন। দেশটির মানুষের জীবনাচারে তার চিন্তাধারার ব্যাপক প্রভাব রয়েছে।
কালবেলা:
সুখ নিয়ে ইনো লিনোর বিখ্যাত কবিতা ‘নকটার্ন’। বাংলায় অনুবাদ করলে যার নাম দাঁড়ায় ‘স্বপ্নমদির সুরলহরী’। এ কবিতায় ইনো লিনো সুখের ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে—
কবি ইনো লিনোর মতোই প্রাচীন রোমে একটা প্রবাদ রয়েছে—‘সুখ নিজের মধ্যে, সুখ কেউ রুপার থালায় সাজিয়ে আপনার সামনে হাজির করবে না।’
মানব জাতির সূচনা থেকেই তার কাছে সবচেয়ে আরাধ্য বিষয় সুখ। খ্যাতনামা দার্শনিক ও বিজ্ঞানীরা যুগে যুগে হন্যে হয়ে খুঁজেছেন মানুষের সুখ আসলে কোথায়! বর্তমানে সুখের যে সূচক রয়েছে, সেখানে তৃতীয় বিশ্বের রাষ্ট্রগুলো পিছিয়ে থাকে অনেকটাই। তবে চলতি বছর সুখী রাষ্ট্রের যে তালিকা প্রকাশ হয়েছে, তাতে পিছিয়েছে অনেক উন্নত রাষ্ট্রও। সেখানে ধারাবাহিকভাবে পিছিয়েছে বাংলাদেশও।
আন্তর্জাতিক সুখ দিবস (২০ মার্চ) উপলক্ষে জাতিসংঘের হয়ে ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস রিপোর্ট প্রকাশ করে মূলত ওয়াশিংটনভিত্তিক আন্তর্জাতিক বাজার গবেষণা ও জনমত জরিপ প্রতিষ্ঠান গ্যালাপ। এ সংগঠন প্রতি বছর ‘সুখী’ দেশের এ তালিকা প্রকাশ করে।
২০২৪ সালের প্রতিবেদনে বাংলাদেশ রয়েছে ১২৯তম অবস্থানে। গত বছর এ অবস্থান ছিল ১১৮তম। সে হিসাবে এ বছর বাংলাদেশের অবস্থান ১১ ধাপ পিছিয়েছে। ২০২২ সালে বাংলাদেশ ছিল তালিকার ৯৪ নম্বরে। একই সঙ্গে এবারই প্রথম বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ দেশ যুক্তরাষ্ট্র ও জার্মানি প্রথম ২০টি সুখী দেশের তালিকায় স্থান পায়নি। দেশ দুটির অবস্থান যথাক্রমে ২৩তম ও ২৪তম। তালিকায় যথারীতি ওপরের দিকে রয়েছে নরডিক অঞ্চলের দেশগুলো। প্রথম পাঁচটি সুখী দেশের মধ্যে ফিনল্যান্ড ছাড়াও রয়েছে ডেনমার্ক, আইসল্যান্ড ও সুইডেন।
ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস প্রতিবেদনে সবচেয়ে সুখী দেশ নির্ধারণের জন্য ৬টি সূচক যাচাই করা হয়। এই সূচকগুলো হলো মাথাপিছু মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি), সামাজিক সহায়তা, সুস্থ জীবন-যাপনের প্রত্যাশা, জীবন-যাপনের ক্ষেত্রে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা, বদান্যতা, দুর্নীতি নিয়ে মনোভাব ও ডিসটোপিয়া।
সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, দেশের মানুষের মধ্যে দিন দিন অস্থিরতা বাড়ছে। বেশিরভাগ মানুষ সম্পদ অর্জনের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হলেও সন্তুষ্ট নয় কেউ। উল্টোদিকে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষ দিন আনা দিন খাওয়া জীবন-যাপন করছেন। তারা চাইছেন যে কোনোভাবে সমাজ-সংসারে টিকে থাকতে।
সুখী দেশ নির্ধারণে যেসব সূচক ব্যবহার করা হয়, তার সঙ্গে বাংলাদেশ তেমন সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কারণ তালিকায় শীর্ষ পর্যায়ে থাকা বেশিরভাগ দেশেই ইউরোপসহ উন্নত বিশ্বের। সেসব দেশের জিডিপির আকার অনেক বড়। সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সেখানে রাষ্ট্র সবল ভূমিকা পালন করে। সুস্থ জীবন-যাপনে যেসব অনুষঙ্গ রয়েছে তার প্রায় সবই নিশ্চিত করে রাষ্ট্র। এ ছাড়া রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা সেবব দেশে চিরন্তন বলা যায়। ব্যক্তির মতামত প্রকাশের স্বাধীনতায় তেমন হস্তক্ষেপ করা হয় না।
সুখ খুঁজে পাওয়ার বিষয়ে দীর্ঘ বছর ধরে গবেষণা করছেন হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক। সম্প্রতি তারা তাদের গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করেন। এতে দাবি করা হয়, মানুষ চাইলেই সুখ খুঁজে পেতে পারে। তবে সে ক্ষেত্রে ক্যারিয়ার, সফলতা বা অর্থ-সম্পদের মধ্যে খুঁজলে হবে না। সুখে থাকার জন্য দরকার মানুষ। দরকার পরিবার আর বন্ধু মিলিয়ে চারপাশে সুন্দর একটা সামাজিক সুস্থতা তৈরি করা। পৃথিবীব্যাপী ৮৫ বছর ধরে চলা এই গবেষণার ফলাফল হলো, মূলত পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে ভালো একটা সম্পর্কই পারে মানুষকে সুখী করে তুলতে। এমনকি খাদ্যাভ্যাস বা ব্যায়ামের চেয়ে পরিবার আর বন্ধু সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
শতাব্দীর পর শতাব্দী এই বাংলায় নানা ধরনের শাসক দ্বারা শাসিত হয়েছে। জলদস্যুদের প্রভাব, ঝড়, জলোচ্ছ্বাস, যুদ্ধ-বিগ্রহসহ নানা সমস্যা লেগেই ছিল। তবে এর পরও সাধারণ বিচারে বাংলাদেশের মানুষ ছিল সুখী। গোয়াল ভরা গরু এবং গোলা ভরা ধান ছিল সুখের অনুষঙ্গ। পরিবারসমেত সুখে-দুখে মিলেমিশে বেশ কেটে যেত তাদের। অবসরে জমত প্রাণবন্ত আড্ডা। তবে সময়ের আবর্তে বদলেছে সব। সেই যৌথ পরিবার ভেঙে এখন একক পরিবারে ঝুঁকছে সবাই। কর্মের প্রয়োজনে ছুটছে দেশ থেকে দেশান্তরে। ফলে কমছে প্রিয়জন, ভাঙছে সামাজিক বন্ধন। আর এসব প্রভাব ফেলছে মানুষের সামগ্রিক জীবনে।
সোসাইটি অব অ্যানথ্রোপলজিক্যাল রিসার্চ ইন বাংলাদেশের (সার্ব) নির্বাহী পরিচালক আহসান হাবীব কালবেলাকে বলেন, ‘উন্নত বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষের সুখের সূচক মেলানো যাবে না। যুগ যুগ ধরে আমাদের মানুষের সুখের অন্যতম অনুষঙ্গ ছিল পারিবারিক এবং সামাজিক মেলবন্ধন। কিন্তু আমরা তথাকথিত উন্নত জীবনের আশায় সেই বন্ধনকে অনেকটা আলগা করে দিয়েছি। ফলে ক্যারিয়ারমুখী হয়ে আর্থিক সফলতা মেললেও মানসিক স্থিতি আসেনি। এর বাইরে মানুষের মধ্যে অল্পতেই তুষ্ট না থাকা এবং ঈর্ষা প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার অভাব, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, ক্ষমতার ভারসাম্য না থাকাসহ নানা কারণেই মানুষের মধ্যে সুখের ইতিবাচক দিক কমেছে।’
তিনি বলেন, ‘শহরগুলোতে মানুষ দিন দিন একাকী জীবন-যাপনে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। প্রকৃতিকে বিনষ্ট করে উঠছে ইট-পাথরের দালান। মাঠ নেই, সবুজ নেই। চারদিকে কেবল গিজগিজ করছে ব্যস্ত মানুষ। শহরে কোনো সামাজিক বন্ধন গড়ে ওঠেনি। একক পরিবারভিত্তিক জীবন-যাপন। এসব অনুষঙ্গ নিয়ে সুখী জীবন-যাপনের সূচকে ওঠা যাবে না।’
গবেষকরা বলছেন, প্রযুক্তির এমন উৎকর্ষের যুগে মানুষের মধ্যে একাকিত্ব বৃদ্ধি পাচ্ছে। কমছে প্রকৃতির সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ। ফলে মেজাজ খিটখিটে হয়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি সামাজিক মাধ্যমে অন্যের সাফল্য দেখে অনেকেই ঈর্ষান্বিত হন।
তারা বলছেন, তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে দ্রুত বাড়ছে নগরায়ণ। কিন্তু সে অনুপাতে সুযোগসুবিধা বাড়ছে না। ঘিঞ্জি কর্মপরিবেশ, উন্মুক্ত জায়গার অভাব, পরিবার থেকে বিচ্ছেদসহ নানা কারণেই মানুষের মধ্যে গ্রাস করছে অসহায়ত্ব। অনেকেই আবার কারও সাফল্যে ঈর্ষান্বিত হন। কিন্তু নিজের চেষ্টার ওপর বিশ্বাসের অভাব। ফলে এক শ্রেণির মানুষ প্রতিনিয়ত হতাশায় নিমজ্জিত হচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের শিক্ষক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক কালবেলাকে বলেন, ‘বাংলাদেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির সমন্বিত রূপ সমাজজীবনের ওপর খুব কমই প্রভাব রাখছে। বরং জনগোষ্ঠীর একটি অংশ ক্রমান্বয়ে আর্থিক ক্ষমতা, মর্যাদা, ভোগবাদসহ পুঁজিবাদের অনুকূল বৈশিষ্ট্যদ্বারা প্রভাবিত ও সুবিধাপ্রাপ্ত । অন্যদিকে, একটি বড় অংশ মৌলিক অধিকার ও বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগসুবিধা থেকে বঞ্চিত। অধিকার ভোগের সমান ক্ষেত্র অনুশীলন এবং নাগরিক দায়িত্ববোধের মধ্য দিয়ে একটি রাষ্ট্রের জনগণ সুখের ঠিকানা খুঁজে পায়। বাংলাদেশে চলমান পরিস্থিতিতে সুখ সবার জন্য নয়। যাদের অর্থ, ক্ষমতা, সামাজিক মর্যাদা, সমাজে প্রভাব বিস্তার করার মতো সক্ষমতা রয়েছে সমাজ তাদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। উন্নয়ন ও অগ্রগতির যাত্রায় সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিতকরণ এবং অবস্থার পরিবর্তনে রাষ্ট্রের সমদৃষ্টি ও পদক্ষেপ ব্যতীত জনগণের মধ্যে সুখের অনুভূতি জাগ্রত করা সম্ভব নয়।’
ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী কালবেলাকে বলেন, ‘মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষ খুব অস্বস্তিতে আছে। মানুষের ব্যয় বেড়েছে, কিন্তু আয় বাড়েনি। দ্বিতীয়ত, দেশের উন্নয়ন হয়েছে, কিন্তু বেকারত্ব কমেনি। তৃতীয়ত, বর্তমানে দেখা যাচ্ছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রারির ঘটনা ঘটছে। শিক্ষকরাই সেখানে জড়িত। এ ধরনের ঘটনা আমরা কখনো দেখিনি। আবার বর্তমানে কিশোর গ্যাং কালচার বেড়েছে। এগুলো আমরা কখনো দেখিনি। আজকে শিশুদের খেলার মাঠ নেই, কিশোররা সুস্থ বিনোদন পাচ্ছে না। তারা নিজেদের মধ্যে ঝগড়া করে, অপহরণ করে, এমনকি তারা খুনাখুনি করে। এগুলো দৃশ্যমান। এগুলো যদি সূচকে প্রতিফলিত হয়ে থাকে, তাহলে তাতে তো বিস্ময়ের কোনো কারণ নেই।’
অ্যাসোসিয়েশন অব সার্জনস ফর স্লিপ অ্যাপনিয়া, বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক ও সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজের ইএনটি সার্জারি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মনিলাল আইচ লিটু কালবেলাকে বলেন, ‘সুখের অপর নাম ঘুম। যাদের ঘুম ভালো হয় তারা সুখীও বটে। অনিদ্রা মানুষকে মানসিক অশান্তি, স্থূলতা ও অন্যান্য জটিল রোগের দিকে ঠেলে দেয়। এসব প্রতিরোধ করতে পারলেই সুস্থ, সবল ও সুখী জাতি গঠন সম্ভব। আর সেই ঘুমের জন্য তৈরি করতে হয় নিরাপদ পরিবেশ। কিন্তু আমাদের শহুরে জীবন ব্যবস্থায় বেশিরভাগ মানুষ সেটাও তৈরি করতে পারে না। ঘিঞ্জি পরিবেশে গাদাগাদি করে বসবাস, প্রাণবন্ত আড্ডার জায়গার অভাব।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. কামাল উদ্দিন কালবেলাকে বলেন, ‘অনেক দেশে বয়স্কদের ভলান্টিয়ারের কাজ করানো হয়। তাদের জন্য পেনশন স্কিম থাকে। আমাদের দেশে বয়স্কদের জন্য তেমন সুযোগ রাখা হয়নি। দেশে বয়স্ক মানুষ মানেই বোঝা। বয়স্ক মানেই বিভিন্ন কাজ থেকে বিচ্ছিন্ন। পারিবারিকভাবে তাদের কিছু অবস্থান থাকলেও সামাজিকভাবে তাদের অবস্থান ভালো নয়। জাপানের উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, দেশটিতে তরুণদের সঙ্গে বয়স্কদের সম্পৃক্ত করা হয়। তাদের খেলাধুলার জন্য বিভিন্ন সুযোগ রাখা হয়েছে। বয়স্কদের জন্য অ্যাসোসিয়েশন রয়েছে। আমাদের সেটি নেই। এ কারণেই আমরা পিছিয়ে পড়ছি। এদিকে নজর দেওয়া উচিত।’
অ্যাসোসিয়েশন অব সার্জনস ফর স্লিপ অ্যাপনিয়া, বাংলাদেশের সভাপতি অধ্যাপক ডা. এস এম খোরশেদ মজুমদার কালবেলাকে বলেন, ‘সুখের সঙ্গে ঘুমের বড় সম্পর্ক রয়েছে। সুখ কম মানে তার ঘুম কম হবে। মানুষের উচ্চাভিলাষ, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও নানা কারণে সুখের সূচকে পিছিয়ে যাচ্ছি।